ভূমিকা

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পর ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ইংল্যান্ডের মহারাজের direct শাসন শুরু হয়। এই সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বেশ কয়েকটি শাসন সংস্কার আইন পাস করে। এইসব শাসন সংস্কার আইনের মধ্যে অন্যতম ও সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ আইন ছিল ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন।


প্রেক্ষাপট

(১) ইংল্যান্ডের রাজনীতি: ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন পাসের সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ঘোষণা করেছিল যে, ১০ বছর পর একটি কমিশনের মাধ্যমে এই আইনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে। সেই অনুযায়ী ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে সাইমন কমিশন গঠনের কথা ছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা কিছুটা আগেই গঠিত হয়।

(২) ভারতের রাজনীতি: ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের আইনের ব্যর্থতা দূর করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে ‘সাইমন কমিশন’ গঠন করে। এই কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় ভারতীয়রা তীব্র নিন্দা জানায় এবং বয়কট করে। কারণ এই আইন ভারতীয়দের স্বায়ত্তশাসন ও দায়িত্বশীল সরকারের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে গান্ধীজির নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস, স্বরাজ দল এবং মুসলিম লীগ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পাঞ্জাবের সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের লাঠিপচার্জে লালা লাজপত রায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।

(৩) গোলটেবিল বৈঠক: সাইমন কমিশনের অনুসন্ধান ও সুপারিশের ভিত্তিতে লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক আহুত হয়। ব্রিটিশ সরকার ও ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে পরপর তিনটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকগুলির আলোচনা ও শ্বেতপত্রের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন।

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের শর্তাবলী

(i) কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়ক শর্ত

(১) যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো: ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশগুলি এবং ইচ্ছুক দেশীয় রাজ্যগুলির সমবায়ে একটি সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

(২) দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা: কেন্দ্রের জন্য দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা (রাজ্য পরিষদ ও কেন্দ্রীয় বিধানসভা) গঠনের ব্যবস্থা করা হয়।

(৩) কেন্দ্রের দায়িত্বহীন শাসন: কেন্দ্রের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়নি; গভর্নর জেনারেলের হাতেই সমস্ত প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল।

(৪) সাম্প্রদায়িক বিভাজন: এই আইনের মাধ্যমে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের পুনা চুক্তি অনুসারে তপশিলি জাতি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ও সংরক্ষিত নির্বাচন ব্যবস্থার পরিধি আরও বাড়ানো হয়।

(ii) প্রাদেশিক সরকার বিষয়ক শর্ত

(১) প্রাদেশিক আইনসভা গঠন: ১৯৩৫ সালের এই আইনে প্রদেশগুলিতে দ্বিকক্ষ ও এককক্ষ বিশিষ্ট প্রাদেশিক আইনসভা গঠিত হয়।

(২) স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা: প্রদেশে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করা হয়।

(৩) মন্ত্রিসভা গঠন: প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার দ্বারা মন্ত্রিসভা গঠনের ব্যবস্থা করা হয়।

(৪) সাম্প্রদায়িক নির্বাচন: প্রাদেশিক স্তরেও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও অনুন্নত জনগোষ্ঠীর জন্য আসন সংরক্ষণ বজায় থাকে।

গুরুত্ব

(১) যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা: এই আইনের দ্বারাই প্রথম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোর মধ্য দিয়ে ভারতে একটি সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট প্রয়াস চালানো হয়।

(২) মন্ত্রীদের জনকল্যাণমূলক কাজ: প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় গভর্নর বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হলেও মন্ত্রীদের দায়িত্বে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন দপ্তর সাফল্যের সঙ্গে পরিচালিত হতে শুরু করে।

(৩) সাংবিধানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা: ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের সুদীর্ঘ কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তিটি অনেকাংশে গড়ে উঠেছিল।

(৪) সর্বোচ্চ আদালত প্রতিষ্ঠা: কেন্দ্র ও বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে বিরোধের আইনগত মীমাংসার জন্য এই আইনের দ্বারাই একটি ‘ফেডারাল কোর্ট’ বা সর্বোচ্চ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়।

(৫) কংগ্রেসের মন্ত্রিসভা গঠন: এই আইনের অধীনে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল জয়লাভ করে এবং দেশের ৯টি প্রদেশে মন্ত্রিসভা বা সরকার গঠন করে।

আরো পড়ো

মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কারের ( ১৯১৯ ) বৈশিষ্ট্যগুলি লেখ ।।এই আইনের ত্রুটিগুলি আলােচনা করাে ।। এই আইনের গুরুত্ব কি ছিল।। উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস 2021 সাজেশন বড় প্রশ্ন